শিল্প ও সাহিত্য

অনীশ আঁধার

খান মুহাম্মদ রুমেল

এই নিন। সকালে আপনি বের হয়ে যাওয়ার পরপরই এসেছে। সকাল থেকে অপেক্ষা করছি আপনার জন্য। এতো রাত করে ফেরে কেউ প্রতিদিন!

রাতে মেসে ফিরতেই খাম খোলা একটা চিঠি আমার হাতে দেন ফরিদ ভাই। টুলুর চিঠি। লন্ডন থেকে লেখা। খামটা খোলা দেখে বিরক্ত লাগে খুব। তার মানে ফরিদ ভাই চিঠিটা পড়েছেন। কোনো মানে হয় এসবের! মুখে কিছুই বলি না। এমনকি বিরক্ত হয়েছি যে, বুঝতে দেই না তাও। আসলে বেশিরভাগ সময় বোকার মতো কাজ করেন ফরিদ ভাই। একটু হাতটানের অভ্যাসও আছে মনে হয়। তারপরও কোনো এক বিচিত্র কারণে ফরিদ ভাইকে খুব পছন্দ করি আমি।

প্রিয় রফিক,
কেমন আছিস। লন্ডন থেকে লিখছি। এখানে এখন রাত। এই চিঠি যখন হাতে পাবি; তখন আমি হয়তো অন্য শহরে। খুব কষ্ট করে এক মাসের ভিসা জোগাড় করেছি। এই একটা মাস খুব ঘুরে বেড়াবো। সুন্দর সুন্দর সব জিনিস দেখবো। জায়গা দেখবো। তারপর ফিরে যাবো নিজের আস্তানায়। আজ সকালে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক লোককে পেছন থেকে দেখে হঠাৎ মনে হলো তুই! রফিক বলে ডাক দিয়েই ফেলছিলাম। হঠাৎ মনে হলো বিলেতের এই শহরে তুই আসবি কোত্থেকে! রফিক তোর মনে আছে, আমাদের ছোটবেলায় একবার খুব বন্যা হলো। আমরা খালার বাড়ি চলে গেলাম! তুই আর মহসিন ভাই আমাদের এগিয়ে দিলি! আজ টেমস নদীর পাশে দাঁড়িয়ে সেকথা মনে পড়ছিল খুব।
ভালো থাকিস।
ইতি, টুলু।

সেবার যখন খুব বড় বন্যা হলো, চারদিকে থইথই পানি। টুলুরা চলে গেলো খালার বাড়ি। সেদিকটাতে পানি ওঠেনি। এক সকালে কলাগাছের ভেলায় করে টুলু আর পনি মামিকে বড় রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন মহসিন ভাই। মহসিন ভাইয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে তখন ছুটি। বন্যার কারণে বন্ধ ছিলো মহসিন ভাইয়ের কলেজ, না-কি অন্য কোনো কারণে, এত বছর পর আর তা মনে নেই। শুধু মনে আছে সাঁতার না জানা টুলু একটা জলচৌকির ওপর বসে ছিল আঁটোসাঁটো হয়ে। কোনো শাপলার পাশ দিয়ে ভেলাটি যেতেই আলগোছে তুলে নিচ্ছিলো টুলু।

পনেরো-বিশ মিনিট ভেলা চালিয়ে আমরা যখন বড় রাস্তায় পৌঁছলাম; ভেলায় তখন একরাশ শাপলা! কী সজীব! কী তরতাজা! বড় রাস্তার কাছে পৌঁছে প্রথমে নামলেন পুনি মামি। তারপর টুলুকে কোলে করে নামালেন মহসিন ভাই। রাস্তায় দাঁড়ানো রিকশায় টুলুরা উঠে বসেছে কি বসে নাই; মহসিন ভাই বললেন, শাপলাগুলো নিবি না-কি রে টুলু? টুলু কিছু বলার আগেই পনি মামি বলেন, থাক দরকার নাই। মহসিন ভাই কিছু বলেন না আর।

চলে যায় টুলুরা। রিকশা যাবে উপজেলা সদর পর্যন্ত। তারপর সেখান থেকে বাসে করে টুলুর খালা বাড়ি! এত বড় বন্যায়ও পানি ওঠেনি সেদিকে। একে টুলু সাঁতার জানে না, তার ওপর ডানপিটে স্বভাব- পুনি মামির তাই খুব চিন্তা ওকে নিয়ে। বন্যার পানি বাড়তে বাড়তে যেদিন একেবারে উঠান পর্যন্ত চলে এলো- আর আমরা ছোটরা সেই পানিতে দাপাদাপি করে বেড়াই। আমাদের ছোটাছুটির কারণে ঢেউ খেয়ে পানি ঘরের ভেতরে ঢুকে যায়। তখন ছিল কাঁচামাটির মেঝে- নানা সেদিন মামিকে ডেকে বললেন, তুমি টুলুকে নিয়ে চেঁচরাকান্দি চলে যাও। পানি কমলে তারপর এসো। মামিও রাজি হন। পরদিন সকালেই যাত্রা করেন মামি আর টুলু।

টুলুদের তুলে দিয়ে ভেলায় এসেই শাপলাগুলো ফেলে দেন মহসিন ভাই। আবার কেন জানি মন খারাপ হয়ে যায়। শাপলার জন্য না-কি টুলুর জন্য! বুঝে উঠতে পারি না। আমার দিকে কোন পাত্তা দেন না মহসিন ভাই। বাড়ি গিয়েই মাছধরার ছিপ কাটতে হবে। ভরা বন্যার পানিতে নতুন নতুন মাছ এসেছে মাঠের বন্দে। অনেক পরিকল্পনা মহসিন ভাইয়ের। বিলের পনিতে একপায়ে একটা সাদা বক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি।
– বক ধরবো না-কি মহসিন ভাই?
– ধুর পাগল! এখন বক ধরবো কেমনে? ডেঙ্গিভিটা যাবো একদিন। ডাহুক ধরবো নে!

একদিন নিজেই বেরিয়ে পড়ি কলাগাছের ভেলা নিয়ে। বাঁশের লগি হাত থেকে ছুটে গেলে পা হড়কে পড়ে যাই বিলের পানিতে। সাঁতার জানি, তবুও হঠাৎ অথৈ পানিতে পরে ভয় পেয়ে যাই। খাবি খেতে থাকি পানিতে। হঠাৎ কোত্থেকে ছুটে আসেন নানা। আমাকে পানি থেকে তুলেই শুরু করেন চোটপাট।
– আজকে যদি ডুবে যেতি, কী জবাব দিতাম তোর মাকে!
ছুটে আসেন বড় মামি। নানার হাত থেকে ছুটিয়ে নেন আমায়। নানা আর কিছু বলেন না। বাড়িভর্তি মানুষের মধ্যে একমাত্র বড় মামিকেই কিছুটা ভয় পান নানা। এরমধ্যে একদিন একটা ছোট্ট কোষা নৌকা কিনে আনেন বড় মামা। সেটাতে করে মাঠের বন্দে মাছ ধরতে যাই। মাঝে মাঝে বড় মামাকে কলেজে যেতে হয় নানা কাজে। মহসিন ভাই তখন মামাকে নৌকা করে পৌঁছে দেন বড় রাস্তা পর্যন্ত। প্রথম প্রথম আমিও যেতাম তাদের সঙ্গে। পরে আর যাইনি।

মাস দুয়েক লাগে বন্যার পানি নামতে। শুরুতে চারদিকে পানি দেখে আনন্দ হলেও একসময় হাপিয়ে উঠি। বড় বিরক্ত লাগে। শেষের দিকের সময়গুলো খুব অস্থির লাগতো। পানি নেমে গেলেও চারদিকে থকথকে কাদা। কাদা শুকাতে না শুকাতেই চলে আসেন পুনি মামি আর টুলু। আবার শুরু হয় প্রতিদিনের নিয়ম ধরা জীবন। সকালে দলবেঁধে একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া। স্কুল থেকে ফিরে এদিক-সেদিক ঘোরা। সন্ধ্যা হলে পড়তে বসা। রাত সাড়ে আটটা-নয়টা বাজতেই সবাইকে খেতে ডাকতেন রহিমার মা। ছোটরা সবাই লাইন ধরে বসতাম পাটি পেতে।

দিন পেরিয়ে সপ্তাহ, মাস, বছর ঘোরে। স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা সামনে। টুলু আমার বয়সে একবছরের ছোট। দুজন একই ক্লাসে পড়ি। পরীক্ষার আগে আগে মা আসে। বাবার সময় হয় না। কখনোই সময় হয় না বাবার। আমি জানি ওসব কিছু না। আসলে আমার দরিদ্র বাবা আসতে চান না এখানে। বাবা ছিলেন আমার নানার বাড়ির আশ্রিত। এখানে থেকে পড়াশোনা করতেন। আমার লাজুক মুখচোরা বাবা কিভাবে যেন মার সঙ্গে জড়িয়ে যান। এক সকালে নানার সামনে গিয়ে আমার মা ঘোষণা করেন ফজলু মাস্টারকে বিয়ে করেছেন তিনি। সব শুনে আমার অভিজাত নানা কোন চিৎকার-চেচামেচি করেন না। শুধু ফজলু মাস্টারকে ডেকে তার স্ত্রী নিয়ে বের হয়ে যেতে বলেন। ফজলু মাস্টার তার স্ত্রী রোকেয়াকে নিয়ে চলে যান তার নিজের বাড়ি। সেই থেকে আর কখনো এ বাড়িতে আসেননি তিনি। এরপর একসময় ফজলু মাস্টার আর রোকেয়ার ঘরে আমার জন্ম। আট বছর বয়স থেকে আমি নানার বাড়িতে। ছোট মামা নিয়ে এসেছেন আমাকে। কারণ ওখানে থাকলে আমার লেখাপড়া তো হবেই না। উল্টো নষ্ট ছেলেপেলের সঙ্গে মিশে একেবারেই বখে যাবো আমি। নানা কোনো আপত্তি করেননি। আর করলেও ছোট মামা তা শুনতেন বলে মনে হয় না। কারণ বড় মামা চুপ থাকলেও ছোট মামা ততদিনে নানার দুয়েক কথার উত্তর দেওয়া শিখেছেন।

স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় আমি টেনেটুনে পাস করলেও টুলু খুব ভালো ফল করে। শহরের নামকরা কলেজে ভর্তি হয় সে। আমাকেও টুলুর সঙ্গে একই কলেজে ভর্তি করাতে চেয়েছিলেন বড় মামা। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা উৎরাতে পারি না আমি। ছুটিতে মাঝে মাঝে বাড়ি আসে টুলু। কত গল্প হয় দুজনের। টুলু শোনায় শহরের গল্প। নতুন বন্ধুদের গল্প। টুলু একসময় পড়তে বিদেশ চলে যায়। উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে নানার বাড়ি ছেড়ে যাই আমি। ছোট মামার ব্যবসা মার খায়। কাজীদের সঙ্গে জমি নিয়ে কয়েকটি মামলা হেরে একেবারেই স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে নানার। বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ একদিন খবর আসে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান মহসিন ভাই। অফিস শেষে বাসায় ফেরার পথে একটি দানব ট্রাক থেঁতলে দেয় মহসিন ভাইকে। মহসিন ভাইকে আঁকরে ধরে পরিবারটি যখন আবার দাঁড়াতে চাইছে; তখন এই মৃত্যু বড় ধাক্কা হয়ে আসে।

বড় মামার কলেজের চাকরির টাকাই তখন পরিবারটির একমাত্র ভরসা। আমি চলে যেতে চাইলে কেউ তেমন আপত্তি করে না শুধু পুনি মামি ছাড়া। বড় মামার মেয়ে টুসির যেদিন বিয়ে হয়ে যায়, তার পরদিন বাড়ি ছাড়ি আমি। পড়াশোনা আর বেশি এগোয় না আমার। ছোট একটা চাকরি নেই। যুদ্ধে নামি বেঁচে থাকার। বাড়িতে অনেকগুলো ভাই-বোন। চাইলেও নানাদের কোনো সাহায্য করতে পারি না। এরমধ্যে খবর পাই বড় মামি পাগল হয়ে গেছেন। কী কষ্ট। কী কষ্ট। জলে ভেসে যায় নানার বাড়ির আভিজাত্য-জৌলুস সব। মাঝে মাঝে চিঠি লেখে টুলু। ও কখনো বলে না কিন্তু আমি জানি টুলুর কোলন ক্যান্সার। খুব বেশিদিন বাঁচবে না সে।

আমিও কখনো টুলুকে মনে করিয়ে দিতে চাই না নিদারুণ বাস্তবতার কথা। নিজের বেদনার কথা, হাহাকারের কথা কখনো টুলু যেহেতু বলে না, আমিও চাই না জানতে। তারপরেও কিভাবে কিভাবে যেন কানে চলে আসে সব কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় যে মেয়েটাকে ভালোবাসতো টুলু; সে-ও যে ওকে ফাঁকি দিয়েছে তা-ও আমার অজানা নয়।

সব ছাপিয়ে আমার চোখে ভাসতে থাকে এক ধবল জোছনা রাত। চারদিকে ফকফকে আলো। ধান কেটে নেওয়ার পর নীরবে বিছিয়ে থাকা মাঠের বন্দে দৌড়ে চলেছি আমি আর টুলু। পেছন থেকে ডাকছে টুসি। আমাদের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মাঠের মাঝে খড়ের গাদায় লুকিয়ে রেখেছি চারটে হাঁসের ডিম। আয়েশার মায়ের খোয়ার থেকে আগের সন্ধ্যায় চুরি করেছিলাম আমি আর টুলু।

এ কোন শৈশবের কথা। এমন দিন কি কখনো ছিল আমার জীবনে? খবর জাগো নিউজ।